Mahalaya:Mahishasuramardini Lyrics in Bengali

Mahishasuramardini Lyrics in :

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র খ্যাত মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ লিপি, সংস্কৃত শ্লোকের বঙ্গানুবাদ |

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;
প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।
আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।
তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।
আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।

মহামায়া সনাতনী, শক্তিরূপা, গুণময়ী।
তিনি এক, তবু প্রকাশ বিভিন্ন—
দেবী নারায়ণী,
আবার ব্রহ্মশক্তিরূপা ব্রহ্মাণী,
কখনো মহেশ্বেরী রূপে প্রকাশমানা,
কখনো বা নির্মলা কৌমারী রূপধারিণী,
কখনো মহাবজ্ররূপিণী ঐন্দ্রী,
উগ্রা শিবদূতী,
নৃমুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা,
তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি।
এই সর্বপ্রকাশমানা মহাশক্তি পরমা প্রকৃতির আবির্ভাব হবে, সপ্তলোক তাই আনন্দমগ্ন।

বাজলো তোমার আলোর বেণু,
মাতলো যে ভুবন।
আজ প্রভাতে সে সুর শুনে
খুলে দিনু মন।
অন্তরে যা লুকিয়ে রাজে,
অরুণ বীণায় সে সুর বাজে;
এই আনন্দ যজ্ঞে সবার
মধুর আমন্ত্রণ।
আজ সমীরণ আলোয় পাগল
নবীন সুরের বীণায়,
আজ শরতের আকাশবীণায়
গানের মালা বিলায়।
তোমায় হারা জীবন মম,
তোমারি আলোয় নিরুপম।
ভোরের পাখি উঠে গাহি
তোমারি বন্দন।

হে ভগবতী মহামায়া, তুমি ত্রিগুণাত্মিকা;
তুমি রজোগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী বাগ্‌দেবী,
সত্ত্বগুণে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী,
তমোগুণে শিবের বণিতা পার্বতী,
আবার ত্রিগুণাতীত তুরীয়াবস্থায় তুমি অনির্বচনীয়া, অপারমহিমময়ী, পরব্রহ্মমহিষী;
দেবী ঋষি কাত্যায়নের কন্যা কাত্যায়নী,
তিনি কন্যাকুমারী আখ্যাতা দুর্গি,
তিনিই আদিশক্তি আগমপ্রসিদ্ধমূর্তিধারী দুর্গা,
তিনি দাক্ষায়ণী সতী;
দেবী দুর্গা নিজ দেহ সম্ভূত তেজোপ্রভাবে শত্রুদহনকালে অগ্নিবর্ণা, অগ্নিলোচনা।
এই ঊষালগ্নে, হে মহাদেবী, তোমার উদ্বোধনে বাণীর ভক্তিরসপূর্ণ বরণ কমল আলোক শতদল মেলে বিকশিত হোক দিকে-দিগন্তে;
হে অমৃতজ্যোতি, হে মা দুর্গা, তোমার আবির্ভাবে ধরণী হোক প্রাণময়ী।
জাগো! জাগো, জাগো মা!

জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো, তুমি জাগো।
প্রণমি বরদা, অজরা, অতুলা,
বহুবলধারিণী, রিপুদলবারিণী, জাগো মা।
শরন্ময়ী, চণ্ডিকা, শঙ্করী জাগো, জাগো মা।
জাগো অসুর বিনাশিনী, তুমি জাগো।
জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো, তুমি জাগো।

দেবী চণ্ডিকা সচেতন চিন্ময়ী, তিনি নিত্যা, তাঁর আদি নেই, তাঁর প্রাকৃত মূর্তি নেই, এই বিশ্বের প্রকাশ তাঁর মূর্তি।
নিত্যা হয়েও অসুর পীড়িত দেবতা রক্ষণে তাঁর আবির্ভাব হয়।
দেবীর শাশ্বত অভয়বাণী—
“ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি ।।
তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্‌ ।।”

পূর্বকল্প অবসানের পর প্রলয়কালে সমস্ত জগৎ যখন কারণ-সলিলে পরিণত হল, ভগবান বিষ্ণু অখিল-শক্তির প্রভাব সংহত করে সেই  কারণ-সমুদ্রে রচিত অনন্ত-শয্যা ‘পরে যোগনিদ্রায় হলেন অভিভূত।
বিষ্ণুর যোগনিদ্রার অবসানকালে তাঁর নাভিপদ্ম থেকে জেগে উঠলেন ভাবী কল্পের সৃষ্টি-বিধাতা ব্রহ্মা।
কিন্তু বিষ্ণুর কর্ণমলজাত মধুকৈটভ-অসুরদ্বয় ব্রহ্মার কর্ম, অস্তিত্ব বিনাশে উদ্যত হতে পদ্মযোনি ব্রহ্মা যোগনিদ্রায় মগ্ন সর্বশক্তিমান বিশ্বপাতা বিষ্ণুকে জাগরিত করবার জন্য জগতের স্থিতি-সংহারকারিণী বিশ্বেশ্বরী জগজ্জননী হরিনেত্র-নিবাসিনী নিরূপমা ভগবতীকে স্তবমন্ত্রে করলেন উদ্বোধিত।
এই ভগবতী বিষ্ণুনিদ্রারূপা মহারাত্রি যোগনিদ্রা দেবী।

ওগো আমার আগমনী আলো,
জ্বালো প্রদীপ জ্বালো।
এই শারদের ঝঞ্ঝাবাতে
নিশার শেষে রুদ্রবাতে
নিভল আমার পথের বাতি
নিভল প্রাণের আলো।
ওগো আমার পথ দেখানো আলো
জীবনজ্যোতিরূপের সুধা ঢালো ঢালো ঢালো।
দিক হারানো শঙ্কাপথে আসবে,
অরুণ রাতে আসবে কখন আসবে,
টুটবে পথের নিবিড় আঁধার,
সকল দিশার কালো।
বাজাও আলোর কণ্ঠবীণা
ওগো পরম ভালো।

তব অচিন্ত্য রূপচরিত মহিমা।
নব শোভা নব ধ্যান রূপায়িত প্রতিমা।
বিকশিল জ্যোতি প্রীতি মঙ্গল বরণে।
তুমি সাধনঘন ব্রহ্ম, গোধন সাধনী,
তব প্রেমনয়নবাতি নিখিল তারণী,
কনককান্তি ঝরিছে কান্ত বদনে।

হে মহালক্ষ্মী জননী, গৌরী, শুভদা,
জয়সঙ্গীত ধ্বনিছে তোমারি ভুবনে।

তখন প্রলয়ান্ধকাররূপিণী তামসী দেবী এই স্তবে প্রবুদ্ধা হয়ে বিষ্ণুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে বাহির হলেন; বিষ্ণুর যোগনিদ্রা ভঙ্গ হল। বিষ্ণু সুদর্শনচক্র চালনে মধুকৈটভের মস্তক ছিন্ন করলেন।পুনরায় ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলেন।

এদিকে কালান্তরে দুর্ধর্ষ দৈত্যরাজ মহিষাসুরের পরাক্রমে দেবতারা স্বর্গের অধিকার হারালেন। অসুরপতির অত্যাচারে দেবলোক বিষাদব্যথায় পরিগ্রহণ হয়ে গেল।
দেবগণ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। ব্রহ্মার বরেই মহিষাসুর অপরাজেয়; তাঁর দ্বারা দৈত্যরাজের ক্ষয় সম্ভবপর নয় জেনে তাঁরই নির্দেশে অমরবৃন্দ কমলযোনি বিধাতাকে মুখপাত্র করে বৈকুণ্ঠে গিয়ে দেখলেন, হরিহর আলাপনে রত।
ব্রহ্মা স্বমুখে নিবেদন করলেন মহিষাসুরের দুর্বিষহ অত্যাচারের কাহিনী। স্বর্গভ্রষ্ট দেবতাকুলের এই বার্তা শুনলেন তাঁরা।
শান্ত যোগীবর মহাদেবের সুগৌর মুখমণ্ডল ক্রোধে রক্তজবার মত রাঙা বরণ ধারণ করলে আর শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী নারায়ণের আনন ভ্রুকূটিকুটিল হয়ে উঠল।
তখন মহাশক্তির আহ্বানে গগনে গগনে নিনাদিত হল মহাশঙ্খ।
বিশ্বযোনি বিষ্ণু রুদ্রের বদন থেকে তেজোরাশি বিচ্ছুরিত হল;
ব্রহ্মা ও দেবগণের আনন থেকে তেজ নির্গত হল।
এই পর্বতপ্রমাণ জ্যোতিপুঞ্জ প্রজ্জ্বলিত হুতাশনের ন্যায় দেদীপ্যমান কিরণে দিঙ্‌মণ্ডল পূর্ণ করে দিলে।
ওই তেজরশ্মি একত্র হয়ে পরমা রূপবতী দিব্যশ্রী মূর্তি উৎপন্ন হল।
তিনি জগন্মাতৃকা মহামায়া। এই আদ্যাদেবী ঋক্‌মন্ত্রে ঘোষণা করলেন আত্মপরিচয়—

অপূর্ব স্ত্রীমূর্তি মহাশক্তি দেবগণের অংশসম্ভূতা; দেবগণের সমষ্টিভূত তেজোপিণ্ড এক বরবর্ণিনী শক্তিস্বরূপিণী দেবীমূর্তি ধারণ করলেন।
এই দেবীর আনন শ্বেতবর্ণ, নেত্র কৃষ্ণবর্ণ, অধরপল্লব আরক্তিম ও করতলদ্বয় তাম্রাভ।
তিনি কখনো বা সহস্রভুজা, কখনো বা অষ্টাদশভুজারূপে প্রকাশিত হতে লাগলেন।
এই ভীমকান্তরূপিণী দেবী ত্রিগুণা মহালক্ষ্মী, তিনিই আদ্যামহাশক্তি।
মহাদেবীর মহামহিমময় আবির্ভাবে বরণগীত ধ্বনিত হয়ে উঠল।

অখিল বিমানে তব জয়গানে যে সামরব,
বাজে সেই সুরে সোনার নুপূরে নিত্যে নব।
হে আলোর আলো, তিমির মিলাল,
তব জ্যোতি সুধা চেতনা বিলাল;
রাগিণী যে ছিঁড়ে গাহিল মধুরে সে বৈভব।

দেবীর আবির্ভাবের এই শুভ বার্তা প্রকাশিত হল।
সকল দেবদেবী মহাদেবীকে বরণ করলেন গীতিমাল্যে, সেবা করলেন রাগচন্দনে।
জগন্মাতা চণ্ডিকা উপাসকের ধনদাত্রী, ব্রহ্মচৈতন্যস্বরূপা সর্বোত্তম মহিমা।
মহাদেবী অন্তর্যামীরূপে ব্যক্ত হয়ে আছেন দ্যুলোক-ভূলোক।
ভুবনমোহিনী সর্ববিরাজমানা জগদীশ্বরী, আপন মহিমায় দ্যাবা পৃথিবী ও সৃষ্টির মধ্যে পরিব্যক্ত হয়ে অবস্থান করেন পরমচৈতন্যরূপা।
মানবের কল্যাণে সর্বমঙ্গলা হোন উদ্বুদ্ধা।

শুভ্র শঙ্খরবে সারা নিখিল ধ্বনিত।
আকাশতলে অনিলে-জলে, দিকে-দিগঞ্চলে,
সকল লোকে, পুরে, বনে-বনান্তরে
নৃত্যগীতছন্দে নন্দিত।
শরৎপ্রকৃতি উল্লাসি তব গানে
চিরসুন্দর চিরসুন্দর চিতসুন্দর বন্দনদানে
ত্রিলোকে যোগে সুরন্ময়ী আনন্দে।
মহাশক্তিরূপা মঞ্জুলশোভা জাগে আনন্দে
মা যে কল্যাণী সদা রাজে,
সদা সুখদা, সদা বরদা, সদা জয়দা, ক্ষেমঙ্করী, সুধা, হ্রদে।
অসুরদশন দশপ্রহরণভুজা রাগে
রণিত বীণাবেণু, মধু ললিত শমিত তানে
শুভ আরতি ঝঙ্কৃত ভুবনে নবজ্যোতি রাগে,
জ্যোতি অলঙ্কারে তানে তানে ওঠে গীতি
সুধারসঘন শান্তি ঝন ঝন জয়গানে।

দেবী নিত্যা, তথাপি দেবগণের কার্যসিদ্ধিহেতু সর্বদেবশরীরজ তেজঃপুঞ্জ থেকে তখন প্রকাশিত হয়েছেন বলে তাঁর এই অভিনব প্রকাশ বা আবির্ভাবই মহিষমর্দিনীর উৎপত্তিরূপে খ্যাত হল।
দেবী সজ্জিতা হলেন অপূর্ব রণচণ্ডী মূর্তিতে।
হিমাচল দিলেন সিংহবাহন,
বিষ্ণু দিলেন চক্র,
পিনাকপাণি শঙ্কর দিলেন শূল,
যম দিলেন তাঁর দণ্ড,
কালদেব সুতীক্ষ্ণ খড়্গ,
চন্দ্র অষ্টচন্দ্র শোভা চর্ম দিলেন,
ধনুর্বাণ দিলেন সূর্য,
বিশ্বকর্মা অভেদবর্ম,
ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা-কমণ্ডলু,
কুবের রত্নহার।
সকল দেবতা মহাদেবীকে নানা অলঙ্কারে অলঙ্কৃত ও বিবিধপ্রহরণে সুসজ্জিত করে অসুরবিজয় যাত্রায় যেতে প্রার্থনা করলেন।
রণদুন্দুভিধ্বনিতে বিশ্বসংসার নিনাদিত হতে লাগল।
যাত্রার পূর্বে সুর-নরলোকবাসী সকলেই দশপ্রহরণধারিণী দশভুজা মহাশক্তিকে ধ্যানমন্ত্রে করলেন অভিবন্দনা।

দেবী অষ্টাদশভুজামূর্তি পরিগ্রহণ করে শঙ্খে দিলেন ফুৎকার।
দেবীর রণ-আহ্বানশব্দ অনুশরণ করে সসৈন্যে ধাবমান হল মহাবলশালী মহিষাসুর।
অসুররাজ লক্ষ্য করলেন মহালক্ষ্মীদেবীর তেজঃপ্রভায় ত্রিলোক জ্যতির্ময়, তাঁর মুকুট গগন চুম্বন করছে, পদভারে পৃথ্বী আনতা আর ধনুকটঙ্কারে রসাতল প্রকম্পিত।
দেবসেনাপতি মহাশক্তির জয়মন্ত্রের গুণে দেবীকে দান করলেন মহাপ্রীতি।

নমো চণ্ডী, নমো চণ্ডী, নমো চণ্ডী।
জাগো রক্তবীজনিকৃন্তিনী, জাগো মহিষাসুরবিমর্দিনী,
উঠে শঙ্খমন্দ্রে অভ্রবক্ষ শঙ্কাশননে চণ্ডী।
তব খড়্গশক্তি কৃতকৃতান্ত শত্রু শাতন তন্দ্রী
নত সিংহবাহিনী ঘনহুংকারে ইন্দ্রাদি চমূতন্দ্রী।
তুমি রণকতন্ত্র টঙ্কারে হানো খরকলম্বজলে
সব রথ তুরঙ্গ ছিন্ন ছিন্ন সুতীক্ষ্ণ করবালে।
নাচো ধূম্রনেত্র দনুজমুণ্ড চক্রপাতনে খণ্ডী,
তব তাতাথৈ তাতাথৈ প্রলয় নৃত্য ধ্বংসে বাঁধন গণ্ডী।

দেবীর সঙ্গে মহিষাসুরের প্রবল সংগ্রাম আরম্ভ হল।
দেবীর অস্ত্রপ্রহারে দৈত্যসেনা ছিন্নভিন্ন হতে লাগল।
মহিষাসুর ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে নানা কৌশল বিস্তার করলে।
মহিষ থেকে হস্তীরূপ ধারণ করলে; আবার সিংহরূপী দৈত্যের রণোন্মত্ততা দেবী প্রশমিত করলেন।
পুনরায় নয়নবিমোহন পুরুষবেশে আত্মপ্রকাশ করলে ওই ঐন্দ্রজালিক।
দেবীর রূঢ় প্রত্যাখ্যান পেয়ে আবার মহিষমূর্তি গ্রহণ করলে।
রণবাদ্য দিকে দিগন্তরে নিনাদিত, চতুরঙ্গ নিয়ে অসুরেশ্বর দেবীকে পরাজিত করবার মানসে উল্লসিত।
দেবীর বাহন সিংহরাজ দাবাগ্নির মত সমস্ত রণক্ষেত্রে শত্রুনিধনে দুর্নিবার হয়ে উঠল।
নানাপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা মধু পান করতে করতে মহিষরূপকে সদম্ভে বললেন,

দেবতাগণ সানন্দে দেখলেন, দুর্গা মহিষাসুরকে শূলে বিদ্ধ করেছেন আর খড়্গনিপাতে দৈত্যের মস্তক ভূলুণ্ঠিত।
তখন অসুরনাশিনী দেবী মহালক্ষ্মীর আরাধনাগীতিসুষমা দ্যাব্যা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হল।

মাগো, তব বীণে সঙ্গীত প্রেম ললিত।
নিখিল প্রাণের বীণা তারে তারে রণিত।
সকল রোদন সেই সুরে গেল মরিয়া।
কালি কালি যত জমেছিল দুখযামিনী
ঊষার মূরতি ধরিয়া বাহির রাগিনী।
জীবন ছিল আলোকসুধায় ধরি তাই।

হে দেবী চণ্ডিকা, তোমার পুণ্য স্তবগাথা ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য, আরোগ্য, শত্রুহানি ও পরম মোক্ষলাভের উপায়। তোমার স্তবমন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত হোক ভূমানন্দের অপূর্ব প্রেরণা।

বিমানে বিমানে আলোকের গানে জাগিল ধ্বনি।
তব বীণা তারে সে সুর বিহারে কি জাগরণে।
অরুণ রবি যে নিখিল রাঙালো,
পূর্ব আঁচলে তন্দ্রা ভাঙালো,
রাঙা হিল্লোলে ধরণী যে দোলে নূপুররণি।

দেবীর অক্ষয় কৃপাকণা পেয়ে সপ্তলোক আনন্দিত।
প্রথম কল্পে দেবী কাত্যায়ান-নন্দিনী কাত্যায়নী, অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডারূপে মহিষমর্দন করেন;
দ্বিতীয় ষোড়শভুজা ভদ্রকালীর হতে মর্দিত হয় মহিষ;
আর তৃতীয়ৈঃ বর্তমানকল্পে দশভুজা দুর্গারূপে মহাদেবী সুসজ্জিতা মহিষমর্দিনী।

হে চিন্ময়ী, হিমগিরি থেকে এলে,
এলে তারে রেখে নির্মল প্রাতে।
বসুন্ধরা যে সুবিমল সাজে অঞ্জলি হাতে।
নবনীলিমায় বাজে মহাভেরী,
দিকে দিকে তব মাধুরি যে হেরি,
সুললিত তালে তালে সুধা আনে আলোকেরি সাথে।
সাজাব যে ডালা, গাঁথিব যে মালা জ্যোতির মন্ত্রে,
তাই অন্তরে অমৃত যে ভরে পুলক তন্ত্রে।
বাণী মহাবর অম্লান মনে,
জননী গো নমি রাতুল চরণে,
পূজায় উল্লাসে ধরণী যে হাসে সুরভিত বাতে।

শ্রীশ্রীচণ্ডিকা গুণাতীতা ও গুণময়ী।
সগুণ অবস্থায় দেবী চণ্ডিকা অখিলবিশ্বের প্রকৃতিস্বরূপিণী।
তিনি পরিণামিনী নিত্যার্দিভ্যর্চৈতন্যসৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় (নিত্যঃ-আদিভ্যঃ-চৈতন্য-সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায়) যে শক্তির মধ্য দিয়ে ক্রিয়াশীলরূপে অভিব্যক্ত হন, সেই শক্তি বাক্‌ অথবা সরস্বতী;
তাঁর স্থিতিকালোচিত শক্তির নাম শ্রী বা লক্ষ্মী;
আবার সংহারকালে তাঁর যে শক্তির ক্রিয়া দৃষ্ট হয় তা-ই রুদ্রাণী দুর্গা।
একাধারে এই ত্রিমূর্তির আরাধনাই দুর্গোৎসব।
এই তিন মাতৃমূর্তির পূজায় আরত্রিকে মানবজীবনের কামনা, সাধনা সার্থক হয়, চতুর্বর্গ (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) লাভ করে মর্তলোক।

অমল কিরণে ত্রিভুবন-মন-হারিণী।
হেরিনু তোমার রূপে করুণা নাবনী,
নমি নমি নমি নিখিল চিতচারিণী,
জাগো পুলক নিত্য নূপুরে জননী।
তোমারেই পূজিছে দেবদেবী দ্বারে দ্বারে,
রাগিণী ধ্বনিছে আকাশবীণার তারে,
তনু-মন-প্রাণ নিবেদি তোমারে মনে।
প্রেম সুর ধন পূজা রূপের এ ধরণী
নমি জগতের সকল ক্ষেমকারিণী
লভিনু তোমার প্রেমে করুণা লাবণি।

ষড়ৈশ্বর্যময়ী দেবী নিত্যা হয়েও বারংবার আবির্ভূতা হন।
তিনি জগৎকে রক্ষা ও প্রতিপালন করেন।
দেবীর করুণা অসীম;
বিধাতৃ বরদার করুণার পুণ্যে বিশ্বনিখিল বিমোহিত;
অমৃতরসবর্ষিণী মহাদেবীর অমল রূপের সুষমা প্রতিভাত ধরিত্রীর ধ্যান গরিমায়।

বিশ্বপ্রকৃতি মহাদেবী দুর্গার চরণে চিরন্তনী ভৈরব ধ্যানরতা পূজারিণী ভৈরবীতে গীতাঞ্জলী প্রদান করে ধন্যা হলেন।
তাঁর গীতবাণী আজ অনিলে সুনীলে নবীন জননোদয়ে দিকে দিকে সঞ্চারিত।

শান্তি দিলে ভরি।
দুখরজনী গেল তিমির হরি।
প্রেমমধুর গীতি
বাজুক হৃদে নিতি নিতি মা।
প্রাণে সুধা ঢালো
মরি গো মরি।

 

This Post Has One Comment

Leave a Reply

Close Menu